সুদে টাকা নিয়ে নতুন ঘর তোলেন আকবর হোসেন। এখনও পরিশোধ করতে পারেননি সেই সুদের টাকা। এর আগেই বন্যার পানির তোড়ে বসতভিটার প্রায় সবটুকুই বিলিন হয়ে গেছে। সাথে বাড়ির পাশে থাকা গাছের শেকড় উপরে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে টিনের তৈরি স্বপ্নের সেই ঘরটি। তাই মাচাঁ বানিয়ে পাশেই ঠাঁই নিয়েছে পুরো পরিবার। এতে করে গত ৯ দিন আশ্রয়হীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারটি।
আকবর লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আমিন উল্যা কমিশনার বাড়ির বাসিন্দা। দুই সন্তান, স্ত্রী ও মা চম্পা বেগমকে নিয়ে ছোট্ট টিনের ঘরেই বসবাস করতেন তিনি। ১৯ আগস্ট রাতে ছোট্ট টিনের ঘরটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। কোনো রকম জীবন বাঁচিয়ে নিজেরা বেঁচে গেলেও রক্ষা করতে পারেনি ঘরটি।
মঙ্গলবার বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ঘরটির বাঁশ ও টিন প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে আছে। ভিটার বেশির ভাগই মাটি পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। নতুন করে যে এখানে ঘর তুলবেন, সেই অবস্থা নেই।
স্থানীয়রা জানায়, আকবরের ঘরের উপর পড়া গাছটি স্থানীয় এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার। বিষয়টি তাদের জানালে আকবরকে মারধর করে তারা। তবে ভয়ে এ কথা কারো কাছে বলে না আকবর।
আকবর হোসেন শিরোনাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘বন্যায় আমার সব শেষ। কোনো রকম থাকার একটু জায়গা আছে। কিন্তু ঘর বানানো তো দূরে থাক, একটা খুঁটি গেড়ে যে মাটি দিমু, এই তৌফিক ও নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চলছিল তার। মা, স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ পাঁচজনের সংসার। তার মা স্ট্রোকের রোগী। এখন মাচাঁ বানিয়ে আছেন পরিবার নিয়ে। ঘর কীভাবে বানাবেন, এই চিন্তায় দিশাহারা তিনি।’
আকবরের স্ত্রী রোজিনা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী ভাড়ায় একটি অটোরিকশা চালিয়েছিল। কিন্তু এই বন্যার মধ্যে ওই অটোরিকশার ব্যাটারি টাও চুরি হয়ে যায়, তারমধ্যে গত ৯ দিন আগে হঠাৎ ঘরের উপর গাছ পরে ঘরটাও ভেঙে চুড়মার হয়ে গেছে। ঘরটা সুদের টাকায় নিয়ে করা হয়েছিল। আমরা আজ নিঃস্ব। আজকে তিনদিন কিছুই খাইনা। আজকে আমার শাশুড়ি অন্য যায়গা থেকে চাল ধার করে এনেছেন। ভাত রান্না করে তরকারি না থাকায় নারকেল দিয়ে খেয়েছি। কেউ কোনো সহোযোগিতাও করে না। কোন রকম একটা টং বানিয়ে এখানে থাকতে আছি। সরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাইনি।’
রোজিনা আরও বলেন, ‘রাতে ঘুমের মধ্যে গাছটা ঘরের উপর পরে, আমার ছোট্ট ছেলেটা বুকে আঘাত পেয়েছে। মেয়েটাও মাথায় আঘাত পেয়েছে। আমার মেয়ে টার বয়স ৬। টাকার অভাবে মেয়েটাকেও স্কুলে ভর্তি করতে পারতেছিনা।’ ঘর ভাঙার পর সুদের টাকার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান গৃহবধূ রোজিনা।
আশি বছর বয়সি আকবরের বৃদ্ধা মা চম্পা বেগম বলেন, ‘খাবারের খোঁজে সকালে ছেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকেল গড়ালেও ফিরে আসেনি। আমি খিদার জ্বালায় আর থাকতে না পেরে একজনের বাসায় গিয়ে কয়টা ভাত চেয়ে খেয়েছি। আমাদের সব শেষ।’
বিলাপ করতে করতে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না। আমরা আছি না মরে গেছি সেটার খবরও জানে না কেউ। আল্লাহ ছাড়া আমাদের কেউ নেই।’
একই এলাকারর আরিফ বলেন, ‘আকবর একজন অসহায় মানুষ। সে রিকশা চালিয়ে কিছু খাবে এখন সেই অবস্থাও নাই। আকবরের অটোরিকশার ব্যাটারি চুরি হয়েছে। সে কারণে তার আয় রোজগারও বন্ধ। পরিবার নিয়া বড় বিপদে পড়ছে। বন্যা তারে পথে নামাই দিছে। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া ঘর করা তার পক্ষ সম্ভব নয়।’
জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুরাইয়া জাহান শিরোনাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা এখন ত্রাণের বিষয়টা নিয়ে কাজ করছি। বন্যা শেষ হলে স্থানীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয় পাঠাব। বরাদ্দ পেলে আকবর ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সহায়তা পাবেন।’
প্রভাবশালীরা নামে-বেনামে কে কত ঋণ নিয়েছে তার হিসাব হচ্ছে: ড. ইউনূস
শিপ্র/শাহোরা/মোআ/