শিরোনাম প্রতিদিন ডেস্ক
টানা ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়ছে সব ধরনের প্রাণী। এর মধ্যে শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী, নকলায় বৃদ্ধ ও নারীসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া ও হালুঘাটের পর এবার আরও কয়েকটি উপজেলায় ঢুকে পড়ছে বন্যার পানি। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। নেত্রকোণার দুর্গাপুরে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ৪০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
শেরপুরে বন্যার পানিতে গত দুই দিনে মোট ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নতুন করে সদর ও নকলা উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতীসহ জেলায় আমন আবাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ভেসে গেছে তিন হাজারেরও বেশি পুকুর ও মৎস্য খামার। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন জেলার কৃষকরা। এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেবেন তা নিয়ে কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হবে।

জানা যায়, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা সদরের পানি কিছুটা নেমে গেলেও নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন আবাদ, মাছের ঘের ও সবজি আবাদ। এদিকে পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও নকলায় বৃদ্ধ ও নারীসহ ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলাসহ জেলার অন্তত ৩৬ হাজার হেক্টর আবাদি জমির আমন ধান তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া ১ হাজার হেক্টর জমির সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরদিকে তিন হাজারেরও বেশী মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। এতে মাথায় হাত পড়েছে আমন ও মাছচাষিদের। সবস্ব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার অন্তত ৬৫ হাজার ৪০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক।
এ ব্যাপারে কৃষক হুরমুজ আলী বলেন, এবারের বন্যা আটাশির বন্যাকেও হার মানাইছে। আমাগো ঘরবাড়ি বানে বাসাইয়া নিয়ে গেছে। আমরা খুব ক্ষতির হইয়া গেছে। নাওয়া, খাওয়া নাই। খুব কষ্ট করতাছি।
কৃষক মোবারক হোসেন বলেন, আমরা বন্যায় খুব বিপদের মধ্যে আছি। আপনারা আমাগো সাহায্য দেন। দুদিন থেইকে পুলাপান নিয়া একবেলা খাইলে দুবেলা উপাস থাকতাছি।
আলেছা বেগম বলেন, এইবার বানে আমরা অনেক বিপদের মধ্যে আছি।

ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ায় গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হওয়ার পর এখন পাশের উপজেলা ফুলপুর ও তারাকান্দার কয়েকটি গ্রামে পানি ঢুকে পড়ছে। রবিবার এমন খবর দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে চারটি উপজেলার লাখো মানুষ। তাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে নিরাপদ স্থানে। তিনটি উপজেলার পানিবন্দিদের জন্য ৩০ টন চাল, নগদ ৩ লাখ টাকা ও শুকনো খাবার বিতরণের কথা জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেন।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে প্রবল বর্ষণ শুরু হয় এবং শুক্র ও শনিবারও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ৩০-৪০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চারদিকে পানি থইথই করছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা পানির নিচে। ঘরের চারদিকেই পানি। এতে আরও দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে তাদের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও এখনও বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সোমেশ্বরী নদীর দুর্গাপুর পয়েন্টে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রবিবার সকাল ৯টা নাগাদ ১৫ ঘণ্টায় ৫০ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। বর্তমানে নদীটির পানি বিপদসীমার শূন্য দশমিক ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছে। নদীটিতে গড়ে ঘণ্টায় সাড়ে তিন সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমেশ্বরী ও পার্শ্ববর্তী নেতাই নদের পানি প্রবেশ করে উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের বন্দউষান, আটলা, পূর্বনন্দেরছটি, হাতিমারাকান্দা, ভাদুয়া, নাওধারা, জাগিরপাড়া, দক্ষিণ জাগিরপাড়া, মুন্সীপাড়া, গাঁওকান্দিয়া, শ্রীপুর, জলিয়াকান্দা, শংকরপুর, তাঁতিরকোনা, বিশ্বনাথপুর, আদমপুর, কান্দাপাড়া, কালাগোনা; অপরদিকে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বিলকাঁকড়াকান্দা, দৌলতপুর, পলাশগড়া, বংশীপাড়া, গাইমারা; কাকৈরগড়া ইউনিয়নের বাইয়াউড়া, বড়বাট্টা, রাত্রা, গোদারিয়া, বিলাশপুর, রামবড়ি, দুর্গাশ্রম এবং চণ্ডীগড় ইউনিয়নের সাতাশি, চারিখাল, নীলাখালী, ফুলপুরসহ ৪০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এদিকে বাকলজোড়া ইউনিয়নেরও বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

রবিবার সকালে সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তা, মাঠ-ঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। স্কুল, মাদ্রাসা, ঘরবাড়ির চারপাশে পানি থৈ থৈ করছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে মানুষ। অপরদিকে এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট।
গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের মুন্সীপাড়া গ্রামের মুহাম্মদ তালুকদার বলেন, আমাদের চলাচলের রাস্তায় কমরপানি, যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে ভয় হচ্ছে ঘরে না উঠে যায়।
চণ্ডীগড় ইউনিয়নের বাসিন্দা মাসুদুর রহমান ফকির বলেন, আমাদের গ্রামে অনেক মানুষ পানিবন্দি, হাটবাজারেও যেতে পারছে না।
বাকলজোড়া গ্রামের ইউপি সদস্য মো. আবু তাহের বলেন, গ্রামের ফসলি জমিগুলোর মধ্যে ৮০ ভাগ পানির নিচে। চলাচলের প্রায় সব রাস্তায় পানি। যেভাবে পানি বাড়ছে তাতে ঘরে ঢুকে যাবে মনে হচ্ছে।
গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য (প্যানেল চেয়ারম্যান) শহিদুল ইসলাম জানান, পানি বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যে অনেকের ঘরে পানি উঠে গেছে। সবাই আতঙ্কে আছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নিম্নাঞ্চলের অনেক মানুষ পানিবন্দি। রবিবার কাকৈরগড়া ইউনিয়নের দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। পানি বৃদ্ধির খবর আসছে সব জায়গা থেকেই। আমরা দুপুরে একটি জরুরি মিটিং ডেকেছি, সেখানে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান বলেন, বৃষ্টি আর উজানের ঢলে জেলার নদ-নদীতে পানি বেড়েই চলেছে। রবিবার বিকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। রাতে উজানে বৃষ্টি হয়েছে, যে কারণে সোমেশ্বরী ও কংস নদে আরও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিপ্র/শাহোরা/