নিজস্ব প্রতিবেদক
বহুল আলোচিত ঘুষ কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত নরসিংদীর সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে এজেলায় এসপি হিসেবে পদায়নের জন্য ৫০ লাখ টাকা ঘুষ প্রদানের অপরাধ বিভাগীয় মামলায় প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধ প্রমানের পরও রহস্যজনক কারণে শাস্তি হিসাবে ‘তিরস্কার’ করা হয়েছে। অথচ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) বিধি অনুসারে ঘুষ লেনদেন, দুর্নীতিপরায়ণতা ও অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ঘুষ লেনদেনসংক্রান্ত লিখিত ও ডিজিটাল ডকুমেন্টের সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগ সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়। তা সত্ত্বেও এরকম গুরু পাপে দেওয়া হয় লঘুদণ্ড। রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আব্দুল হান্নান বর্তমানে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার হিসাবে কর্মরত। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, অভিযুক্ত এ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর বাইরে গুরুতর অনেক অভিযোগ রয়েছে। তবে যা প্রমাণিত হয়েছে, তাতে চাকরিবিধি অনুযায়ী বরখাস্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ ধরনের তিরস্কারের প্রজ্ঞাপন দেখে সবাই বিস্মিত হয়েছেন। তারা বলেন, এর চেয়ে সামান্য অপরাধ করেও সম্প্রতি একজন সৎ ও পেশাদার ডিআইজিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। আবার অনেক বলছে এ যেন গুরু পাপে লঘুদণ্ড।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পলাতক আসাদুজ্জামান খান কামালকে ঘুষ দিয়ে পোস্টিং পেতে চেয়েছিলেন এই আব্দুল হান্নান। শুধু তাই নয়, তিনি তার অধীনস্থ নরসিংদীর সাবেক ডিবি পরিদদর্শক এসএম মো. কামরুজ্জামানের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে টাকা নেন। এসব অভিযোগ নিয়ে ‘ওপেন ঘুষ কারবার যার নেশা, বেসামাল নরসিংদীর এসপি’ শিরোনামে ৬ এপ্রিল যুগান্তরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর এই এসপির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাপরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী ডিবি পরিদর্শক এসএম কামরুজ্জামান। সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নৈতিকস্খলনের অভিযোগে ৬ মাস ধরে তিনি সাময়িক বরখাস্ত আছেন। অথচ ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও আব্দুল হান্নানকে নরসিংদী থেকে বরিশালে রুটিন বদলি করা হয়। বিষয়টিকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন পুলিশের একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, এসপি আব্দুল হান্নান ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট। অথচ তাকে দণ্ড হিসাবে তিরস্কার দেওয়া হয়েছে। এই দণ্ডের কারণে তার চাকরিতে কোনো প্রভাব পড়বে না।
তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান। এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের একই ধরনের মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন ডিআইজি মিজানুর রহমান। ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ৭ বছর বছর সাজা হয় দুদকের পরিচালক আব্দুল বাছিরের। আইনে ঘুষ দেওয়া আর নেওয়া সমান অপরাধ। সেক্ষেত্রে আব্দুল হান্নান সাবেক সরকারের পলাতক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঘুষ দিয়ে পোস্টিং পাওয়ার অপচেষ্টা করেছিলেন, বিষয়টি প্রমাণিত।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নরসিংদীর সাবেক এসপি মো. আব্দুল হান্নান সংশ্লিষ্ট জেলায় যোগদানের আগে ২০২৩ সালে পুলিশ সুপার হিসাবে জেলায় পদায়ন পেতে রবিউল মুন্সী নামে একজনকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দেন। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে রবিউল মুন্সী তাকে পুলিশ সুপার হিসাবে পোস্টিং দিতে ব্যর্থ হন। এদিকে সরকার পতনের পর আব্দুল হান্নান এই তদবিরের বাইরে অনেকটা নাটকীয়ভাবে নরসিংদী জেলায় এসপি হিসাবে পোস্টিং পান।
এরপর তিনি ক্ষমতার প্রভাবে রবিউল মুন্সীর কাছ থেকে গত বছরের ৯ নভেম্বর অধীনস্থ ডিবি ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) এসএম কামরুজ্জামানকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ঢাকায় পাঠান। তিনি ঢাকার বিজয় সরণিসংলগ্ন রবিউল মুন্সীর মণিপুরিপাড়ার অফিসে গিয়ে ৫ লাখ টাকা আদায় করেন। অবশিষ্ট ৪৫ লাখ টাকা উদ্ধারে পুলিশ পরিদর্শক এসএম কামরুজ্জামানের সমন্বয়ে স্বহস্তে একটি লিখিত ডকুমেন্ট তৈরি করে স্বাক্ষর নেন। প্রসঙ্গত, বই বিক্রেতা জনৈক রবিউল মুন্সির সঙ্গে পলাতক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘনিষ্ঠতা ছিল।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, পরবর্তী সময়ে যুগান্তরের সাংবাদিক নেসারুল হক খোকনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথোপকথনের সময় তার বদলি সংক্রান্ত এবং অধীনস্থ পুলিশ সদস্যকে ব্যবহারের বিষয়টি আব্দুল হান্নান স্বীকার করেন। তিনি পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা হয়ে ওই সাংবাদিকের সঙ্গে এরূপ নেতিবাচক বিষয়ে আলাপ করা, তার অধস্তন পুলিশ সদস্যকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা এবং ওই ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় জনসম্মুখে পুলিশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে আব্দুল হান্নানকে কারণ দর্শানো হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল হান্নান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিল করে ব্যক্তিগত শুনানির অনুরোধ করেন। ১৯ নভেম্বর আব্দুল হান্নানের ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিকালে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, লিখিত জবাব, অনুসন্ধান প্রতিবেদন, উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং উপস্থাপিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণাদি পর্যালোচনায় আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাকে ‘তিরস্কার’ দণ্ড প্রদান করা হয়।[তথ্য সুত্র-দৈযু]
শিপ্র/শাহোরা/