খেলাধূলা ডেস্ক
পরিস্থিতি এমন ছিল, হয় বাংলাদেশ দাপটের সঙ্গে জিতবে নয়তো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতার পর জিতবে। নিউজিল্যান্ড জিততে পারবে কিংবা জিততে পারে এমন ভাবনা কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি! অথচ যেই ভাবনা কেউ আনতে পারেনি সেই বিশ্বাসটাই ছিল নিউ জিল্যান্ডের ড্রেসিংরুমে। তাইতো স্বল্প পুঁজি নিয়ে কীভাবে ম্যাচ জিততে হয় তা দেখিয়ে দিল অতিথিরা। অন্যদিকে তালগোল পাকিয়ে প্রতিপক্ষকে স্রেফ ম্যাচটা উপহারই দিয়ে আসল মেহেদী হাসান মিরাজের দল।
লড়াইটা তাওহীদ হৃদয় একাই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মিছিলে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে নিউ জিল্যান্ডের নিশ্চিত জয়ের একমাত্র বাধা হয়ে ছিলেন তিনি। পেসার নাথান স্মিথকে ছক্কা মেরে দ্বাদশ ফিফটি তুলে নিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু দলকে জেতাতে যে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হতো, সেখানে ব্যর্থ হয়েছেন। তাতে মিরপুর শের-ই-বাংলায় পরাজয়কে সঙ্গী করেছে বাংলাদেশ।
নিউ জিল্যান্ড প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে ২৬ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ শুরু করলো। আগে ব্যাটিংয়ে নেমে নিউ জিল্যান্ড ৮ উইকেটে ২৪৭ রান করে। জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশের ইনিংস থেমে যায় ২২১ রানে।
মিরপুরের উইকেট নিয়ে আগেভাগে অনুমান করা কঠিন। উইকেট যেমনটা সবুজ মনে হয়েছিল তেমন আসলে ছিল না। বল উচুঁ-নিচু হয়েছিল। ছিল ধীর গতিরও। তাতে দুই দল চমকে যাওয়ারই কথা। কারণ গতকাল ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে দুই দলই বলেছিল, ট্রু উইকেট পেতে যাচ্ছে। কিন্তু ২২ গজে মিলল ভিন্ন কিছু।

টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া নিউ জিল্যান্ডের শুরু থেকে লক্ষ্য ছিল পরিস্থিতি অনুযায়ী আগানো। বাড়তি ঝুঁকি না নিয়ে সাবলীল ব্যাটিং ছিল তাদের ভরসা। তবে বাংলাদেশের আক্রমণের সামনে তাদের উদ্বোধনী জুটি বেশিক্ষণ টেকেনি। নাটকীয়ভাবে মোস্তাফিজুর রহমানের পরিবর্তে একাদশে সুযোগ পাওয়া শরিফুল ইসলাম নিক কেলির (৭) উইকেট উপচে ফেলেন সপ্তম ওভারে।
সেখান থেকে দুই অভিজ্ঞ নিকোলস ও ইয়ং ৭৩ রানের জুটি গড়েন। দলের দাবি মিটিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা এগিয়ে যান। বাংলাদেশের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ নিজের সব অস্ত্র ব্যবহার করে ব্যাটসম্যানদের মনোবলে চিড় ধরাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত রিশাদ হোসেন এগিয়ে আসেন। ইয়ং রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন ৩০ রানে।
এরপর বাংলাদেশ কিউই ইনিংসের লাগাম টেনে ধরেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ২ সেঞ্চুরি ও ৫ ফিফটি থাকা টম লাথামকে ১৪ রানে বোল্ড করেন মিরাজ। রিশাদ টিকতে দেননি ফিফটি পাওয়া নিকোলসকে। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৬৮ রান করে নিকোলস লিটনের গ্লাভসবন্দী হন। এরপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে কেবল অতিথিদের হয়ে লড়াই করেন ডেন ফক্সক্রফট। ৫৮ বলে ৮ চারে তার ৫৯ রানের ইনিংসে নিউ জিল্যান্ড পেয়ে যায় কাঙ্খিত লক্ষ্য।
মোস্তাফিজুরের অস্বস্তিতে সুযোগ পাওয়া শরিফুল ১০ ওভারে ২ মেডেনে ২৭ রানে ২ উইকেট নেন। তার করা ৪২ বলই ছিল ডট। এছাড়া ২টি করে উইকেট পেয়েছেন তাসকিন ও রিশাদও। ১টি করে উইকেট নেন নাহিদ রানা ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
সাড়ে তিন ঘণ্টায় নিউ জিল্যান্ডের ইনিংস শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাড়তি সময় লেগেছিল ৪৫ মিনিট। গরমের জন্য একটি বাড়তি ড্রিংকস ব্রেক, চারটি রিভিউ এবং একটি ইনজুরির ব্রেকও ছিল। তারপরও বাংলাদেশের বোলিং ইনিংসে ধীর গতি ছিল। তিন পেসার শরিফুল, তাসকিন ও নাহিদ সময় নিয়ে বোলিং করেছেন।
বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল বাজে। শুরুতে তানজিদ হাসান (২) ও নাজমুল হোসেন শান্ত (০) উইকেট থ্রো করে আসেন পেসার স্মিথকে। হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়ে পাননি স্মিথ। তৃতীয় উইকেটে হাল ধরেন সাইফ ও লিটন। ১ রানে জীবন পাওয়ার পর সাইফ নিজের সাবলীল খেলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নিউ জিল্যান্ড তাকে ছাড় দেয়নি। লিটনেরও তাই। দুজনের ইনিংস এগিয়েছে ধীর গতিতে। ১১৬ বলে করেছেন ৯৩ রানের জুটি। মনে হচ্ছিল তারাই দলের জয়ের কাজটা করে দেবেন। সাইফ তুলে নেন ফিফটি। লিটন এগিয়ে যান সেই পথেই। কিন্তু মিস টাইমিংয়ে সাইফ ৫৭ রানে ক্যাচ তুলে দিলে বাংলাদেশের খেলার ধরণও পাল্টে যায়।
সঙ্গী হারানোর পর লিটন ৪৬ রানে আউট হন। এরপর আফিফ ও তাওহীদের সংগ্রাম শুরু হয় ২২ গজে। ৭৯ বলে ৫২ রান যোগ করেন তারা। যেখানে বিদঘুটে ইনিংস খেলেন আফিফ। ৪৯ বলে কোনো বাউন্ডারি ছাড়া ২৭ রান করেন। তবুও টিকে ছিলেন। লড়াই করছিলেন। কিন্তু তার হাল ছেড়ে দেওয়ার পরপরই বাংলাদেশের পরাজয়ের ঘণ্টা বাজতে শুরু করে। মিরাজ ৬, রিশাদ ৪, শরিফুল ০ ও তাসকিন ২ রানে আউট হয়ে বাংলাদেশকে চরম বিপদে ফেলেন। তাওহীদ সিঙ্গেল-ডাবলসে চেষ্টা চালান। কিন্তু তাকে সঙ্গ দেওয়ার কেউ ছিল না। বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে শট খেলতেই হতো। সেই শট খেলতে গিয়েই বিপদে পড়েন।
স্মিথের শর্ট বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিড উইকেটে তালুবন্দী হন ৫৫ রানে। সেখানেই থেমে যায় তার ২টি করে চার ও ছক্কায় সাজানো ইনিংস। বাংলাদেশের পরাজয়ও লিখা হয়ে যায় সেখানেই। বল হাতে ২৫ রানে ১ উইকেট ও ব্যাটিংয়ে ফিফটি তুলে নিউ জিল্যান্ডের জয়ের নায়ক ডিন ফক্সক্রফট। এছাড়া তাদের সেরা বোলার ব্লায়ার টিকনার ৪০ রানে ৪টি উইকেট নেন। ৪৫ রানে ৩ উইকেট পেয়েছেন স্মিথ।
আগামী সোমবার সিরিজ বাঁচানো লড়াইয়ে নামবে বাংলাদেশ।
শিপ্র/শাহোরা/