ড়দেশে ধর্ষণ, হত্যা ও নিপীড়নের মতো সহিংস ঘটনার কারণে ২০২৫ সালে শিশুদের নিরাপত্তা ঝঁুকি ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে বলে দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় তথ্য উঠে এসেছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এর ‘শিশু অধিকার পরিস্থিতি ২০২৫’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক হাজার ৮৬৭টি নেতিবাচক ঘটনার মধ্যে ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশই শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এসব ঘটনার সংখ্যা এক হাজার ১৭০টি। রবিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে এক বক্তা বলেছেন, ‘শিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নে আর কোনো আপস, অপেক্ষা বা অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় সমাজের নীরবতা ভাঙতে হবে। আইনকে হতে হবে তৎপর। রাষ্ট্রকে হতে হবে সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য।’ তাঁর এই বক্তব্য চমকপ্রদ ও শ্রবণ—সুখকর হলেও আমাদের সমাজ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে গবেষণাকর্মটি (২০২৫ সনের ভিত্তিতে) করা হয়েছে, সেখানে যদি সহিংসতার শিকার শিশুদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থানের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হতো তাহলে দেখা যেত— অধিকাংশ নির্যাতিত শিশুই অস্বচ্ছল ও দারিদ্র পরিবারের সন্তান। অপরাধীদের অর্থনৈতিক অবস্থান চিহ্নিত করলে সেখানে নির্যাতিতের তুলনায় স্বচ্ছল পরিবারের ব্যক্তিদের কথা উঠে আসতো। চরম বৈষম্যপীড়িত এই দেশে নীচের স্তরে অবস্থানকারী মানুষগুলোকে নির্যাতন করার এক ধরনের বৈধতা দিয়ে দিয়েছে বিদ্যমান সমাজ পরিসর। সহিংসতার শিকার ব্যক্তি ও পরিবার সামাজিকভাবেও যেমন বিচার পান না তেমনি আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার প্রতিকার পেতেও তাঁরা ব্যর্থ হন। কারণ বিচার পেতে যে কাঠামো রাষ্ট্র সাজিয়ে রেখেছে তা অনেক বেশি ব্যয় ও ঝক্কিবহুল। দরিদ্র পরিবারের নির্যাতিতরা আর্থিক অনটন ও জটিলতারণ কারণেই প্রচলিত বৈচারিক কাঠামো থেকে কোনো সুবিচার না পেয়ে সৃষ্টিকর্তার দরবারে বিচার চেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়। এমন অসম সমাজ বাস্তবতা ও আর্থ—রাজনৈতিক কাঠামোর ভিতর যেখানে অপরাধ—অপকর্ম থামানোই কষ্ট কল্পনার বিষয়বস্তু সেখানে কেবলমাত্র শিশু নির্যাতন বন্ধ করার আকুলতাও এক ধরনের বেয়াক্কেলপনারই নামান্তর। আসল কথা বলতে চাইলে বলতে হবে— প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার, যেখানে নৈতিকতার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়া হয়, যেখানে আর্থিক সক্ষমতার তুল্যমূল্যে অপরাধীকে বিবেচনা করা হয়; সেই অসম ব্যবস্থার পরিবর্তনের পথ অনুসন্ধান করা।

গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানকারী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘শিশু অধিকার সুরক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। তাই আগামী সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে শিশু অধিকার নিশ্চিতকরণে অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।’ এই আশাবাদও একেবারেই মামুলি ও গতানুগতিক ধারার। বাংলাদেশের কোন্ রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে ভালো ভালো অঙ্গীকার, প্রতিশ্রম্নতি ও পরিকল্পনা থাকে না ? বাংলাদেশে কি শিশু সুরক্ষার বিষয়ে আইনের কোনো অভাব আছে ? প্রতিশ্রম্নতি ও আইনের অভাব নেই দেশে। অভাব প্রতিশ্রম্নতি পূরণের লক্ষ্যে সংকল্পবদ্ধ দৃঢ় অঙ্গীকার এবং আইনের সাবলীল ও কার্যকর প্রয়োগ। মানুষকে অপরাধ করা থেকে বিরত থাকার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের একটি নৈতিক ভিত্তি দরকার হয়। রাষ্ট্র যদি ন্যায়পরায়ণ, দুর্নীতিবিমুখ ও বৈষম্যহীন হয় তাহলে রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক সমাজও ওই নীতিবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পায়। আমরা একটি চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও বৈষম্যময় সমাজে বসবাস করি। এখানে যে কেউ খুব সহজে বিপুল বিত্ত ও সম্পদের মালিক বনতে চায়। বনতে চায় এজন্য যে, বিত্ত—সম্পদের মালিক হয়ে গেলে সে এক শ’ অপরাধ করেও সমাজে বুক ফুলিয়ে চলতে পারবে। ব্যক্তির এই মানসিকতা তৈরি হয় রাষ্ট্র—চরিত্র থেকে। তাই সবকিছুর মূলে ওই রাষ্ট্র—চরিত্রের প্রভাব। আমরা যদি শিশু নির্যাতনসহ সমাজে বিরাজিত সব ধরনের অন্যায় বিলুপ্ত করতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের দিকে মনোযোগী হতে হবে। নতুবা এইসব পরিসংখ্যান ও কথার চমৎকারিত্ব কেবল অরণ্যে রোদনই হবে। ভ্রমণ গাইড

এমজেএফ নামক প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা অন্তত একটি সত্য সকলের সামনে উন্মোচন করেছে। তা হলো— শিশুর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও সংবেদনশীল নয়। আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজকের শিশু আগামী দিনের দেশের দায়িত্বশীল নাগরিক। সহিংসতার শিকার হতে হতে বেড়ে উঠে যে শিশু সে জীবনের শুরু থেকেই তার চার পাশের অন্ধকারের মধ্যে বড় হয়। সে যখন দেখে তার প্রতি হওয়া অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে হাঁটে তখন তার ভিতর যে বৈষম্যবোধ তৈরি হয় তা কেবল ভাবী কালের দেশকে নষ্ট করে না, গ্রাস করে মানুষের মানবিকতাও।
শিপ্রশাহোরা/