”সুখ পাইলামনারে সুখ পাইলাম না" এমনি বিলাপের সুরে চোখের পানিতে বুক ভাসাচ্ছে সাদিহা। তার চোখের পানিতে পাষাণে মন কাদলে মন গলাতে পারেনি স্বামী মিজান ও তার শ্বশুর সাগরোর কঠিন হৃদয়। সাহিদার চারপাশের বাতাস কেমন ভারী হয়ে উঠে। এমন পরিস্থিতিতে যে কোন মানুষের চোখের পানি ধরে রাখা দায়।
কোলে থাকা দুই বছরের শিশু কন্যা মেহেরিন — যার নিষ্পাপ চোখ শুধু প্রশ্ন ছুড়ে দেয়— কেন এমন হলো মা?
সাহিদা নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের গ্রামের প্রবাসী কাশেম আলী ও -মর্জিনা খাতুন দম্পতির মেয়ে। প্রায় ৪ বছর পূর্বে মেয়ে সাহিদাকে বিয়ে দেয় একই উপজেলা চরাঞ্চল শ্রীনগর ইউনিয়নের শ্রীনগর গ্রামের সাগর মিয়ার ছেলে মিজানের সাথে।
বিয়েতে যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয় নগদ দেড় লাখ টাকা স্বর্ণালঙ্কার তাছাড়া মেয়ে থাকার জন্য একটি ঘর পর্যন্ত তুলে দেন। এখানেই ক্ষান্ত হয়নি মিজান ও তার পরিবার। বিয়ের পর খয়েকদিন পর থেকে মিজান তার স্ত্রী সাহিদাকে বাবার বাড়ী থেকে টাকা-পয়সা এনে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে এবং সেই সাথে মারধর। একসময় মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে সাহিদার মা-বাবা মিজানকে দুবাই পাঠায়। কিন্তু সেখানে বেশীদিন থাকতে পারেনি। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সে দেশে ফিরে আসে।
এদিকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করে মেয়ের জামাইকে বিদেশ পাঠানো কিছু দিনের মধ্যে পূনরায় দেশে ফিরে আসায় অনেকটা আশাহুত হন সাহিদার মা মরজিনা বেগম।
এদিকে যাওয়ার পূর্বে মাছ ধরতে মিজান রাঙ্গামাটির কাপ্তাই লেকে যায় সেখানে সেখানে সুমি নামে একটি মেয়ের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাছ ধরা শেষ হলে সে রাঙ্গামাটি থেকে চলে আসলেও মোবাইলে তাদের যোগাযোগ ঠিক চলতো আর এর জন্যই শ্বশুড় বাড়ীর টাকায় বিদেশ গিয়েও সে থাকতে পারেনি দেশে চলে আসতে হয়েছে। দেশে ফিরে আসের পর সুমির সাথে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে মিজানের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় সাহিদা। তাই বিভিন্ন অজুহাতে তার উপর চালাত নির্যাতনের স্টিমরোলার যাতে সহ্য না করে চিরতরে চলে যায়। আর এই নির্যাতন শরিক মিজানের বাবা সাগর মিয়া ও তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী ফাতেমা বেগম। তারা কখনোই ছেলেকে ডাক দোহাই দিতো না বরং ছেলেকে উস্কে দিতো।
এরই মধ্যে মিজান সুমিকে গোপনে বিয়ে করে ফেলে। ঘরবাড়ী ছেড়ে রায়পুরা উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায় থাকতে শুরু করে।
গত ২৫ অক্টোবর সাহিদাও তার মা শ্রীনগর এলাকায় তার খালার বাড়িতে যাওয়ার পথে মিজানসহ তার কয়েকজন সহযোগী সন্ত্রাসীরা বাঁশের লাঠি, মাইরের কাঠ, লোহার পাইপ ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের হামলা চালায়। এসময় মিজান সাহিদাকে ঝাপ্টে ধরে তার গলায় উড়না পেচিয়ে শ্বাসরোদে হত্যার চেষ্টা চালায়। মেয়ের এ অবস্থায় সাহিদার মা মর্জিনা বেগম এগিয়ে যেতে চাইলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করে। পরে তারা ডাক-চিৎকার করতে গেলে তাদের চুলের মুঠি ধরে মারধর করতে থাকে। এক পর্যায়ে সাহিদার গলা থেকে তার ব্যবহৃত ১ ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেয় এবং হাতে থাকা অপো ব্রান্ডের একটি এণ্ড্রয়েট মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এসময় লোকজন আসতে দেখে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।যাওয়ার সময় সাহিদাকে হুমকি দেয়— এই ঘটনায় মামলা করলে তাকে হত্যার পর গুমের হুমকি দেয়।
এঘটনায় সাহিদা নিজে বাদী হয়ে তার স্বামী মিজান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি, মারধর, স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ছিনতাই এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে নরসিংদী আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
এজাহারে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে মারধর, শ্লীলতাহানি, মূল্যবান মালামাল চুরি ও হত্যার হুমকি দিয়ে আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ করেছে।
স্থানীয়ভাবে সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সাহিদা থানায় গিয়ে মামলা করতে ব্যর্থ হন। পরে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়ে এই মামলা দায়ের করেন।
এব্যাপারে কথা বলতে সাহিদার স্বামীর বাড়ী শ্রীনগর এলাকায় গিয়ে কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি। মিজানে বাবা মিজানের বাবা সাগর মিয়ার নাম্বারে ফোন করলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
শ্রীনগর গ্রামের বাসিন্দা বাসেদ মিয়া বলেন, বিয়ের সময় চাহিদার মা-বাবা দেড় লাখ টাকা যৌতুক হিসেবে দিয়েছে। পরবর্তীতে তাদের পারিবারিক একটা দ্বন্দ্বে স্থানীয়ভাবে একটি দরবার হয়। ওই দরবারে আমরা যৌতুকের বিষয়টি জানতে পারি। পরে মিজান সাহিদার বাবার বাড়িতে গেলে আলমারি ভেঙ্গে আড়াই লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায় বলে জানতে পারি। গত মাস ছয়েক আগে মিজান তার স্ত্রীসন্তান রেখেই দ্বিতীয় বিয়ে করে। দ্বিতীয় বিয়ে পর বাড়িতে থাকাকালীন দেখতাম প্রায় সাহিদাকে মারধর করতো। এক পর্যায়ে তাকে মারধর করে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তারাও গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। স্ত্রী ও দুই বছরের শিশুকন্যার ভরণ পোষণ তো দূরে থাক তাদের খোঁজ খবরও নেয় না বলে শুনেছি।
এ অবস্থায় সাহিদা আদালতে করা মামলার আরজিতে বিজ্ঞ আদালতের কাছে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আবেদন জানিয়েছেন।