চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
সনাতন ধর্মলম্বীদের হাজারো বছরের তীর্থস্থান চন্দ্রনাথে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী শিবচতুর্দশী উৎসব। রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে পবিত্র দিন শিবরাত্রি উপলক্ষে শনিবার থেকে এ উৎসব শুরু হয়।
শিবচতুর্দশী তিথিতে চন্দ্রনাথ ধামে সমবেত হয়েছে লাখো পূণ্যর্থী। শনিবার শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী শিবচতুর্দশী উৎসব শেষ হবে আগামীকাল সোমবার বিকেলে।
শিবরাত্রি উপলক্ষে প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের শিব চতুর্দশী তিথিতে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধামে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তীর্থ করতে আসেন।

তবে উৎসবকে ঘিরে গত বছর থেকে বৈধিক সম্মেলনসহ নানা অনুষ্ঠান নানা প্রতিকূলতার কারণে হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা হিন্দুধর্মালম্বী নেতারা।
সীতাকুণ্ড স্রাইন(তীর্থ) কমিটির সহকারী ব্যবস্থাপক তুষার চক্রবর্তী বলেন, শিবচতুর্দশী তিথি শুরু শনিবার বিকেল ৫টা ১৮ মিনিট পর। সেটি ছেড়ে যাবে সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা ২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড পর। এরপর আমাবস্যা আরম্ভ।
শিবচতুর্দশী মেলার প্রথম দিন ত্রয়োদশীতে তারা সংযম পালন করে। চতুর্দশী তিথিতে ব্রত রেখে স্নান তর্পণ করেন। এরপর সীতাকুণ্ডের মঠ মন্দির পরিক্রমা করে স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির এবং চন্দ্রনাথ মন্দিরের শিবের মাথায় জল ঢালেন। তৃতীয় দিন অমাবস্যা তিথিতে মৃত পূর্ব পুরুষের আত্মার সন্তুষ্টির জন্য শ্রাদ্ধ করেন।

তবে সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা তীর্থধাম এলাকায় পরিদর্শন করেছেন।
সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির সহকারী ব্যবস্থাপক তুষার চক্রবর্তীর বলেন, প্রতিবছর এই দিনে তীর্থযাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত হতো। এ বছর নির্বাচনকালীন সময় থাকায় এখনও তীর্থযাত্রী তেমন দেখা যাচ্ছে না।
সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশ বলেন, মেলায় তীর্থযাত্রী আসবে এটাই স্বাভাবিক ধরে নিয়ে তারা মেলার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। প্রতিবছরের মতো তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে একাধিকবার সভা করেছেন। ইতোমধ্যে তারা বিভিন্ন মঠ মন্দিরের সংস্কার এবং চন্দ্রনাথ মন্দিরে ওঠার পথে সংস্কারের কাজ শেষ করেছেন। তীর্থের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে চন্দ্রনাথ ধাম।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মেলা কমিটির নির্বাহী সভাপতি মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটি মেলার ধর্মীয় আয়োজন সম্পূর্ণ করেছে। নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশ এবং সেনাবাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে। সর্বক্ষনিক থাকবে মেডিক্যাল টিম ও জল। এবারের মেলা নিরাপদ হবে এমন আশা করছেন তিনি।
যেভাবে তীর্থ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ২০০ফুট উপরে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় থাকা চন্দ্রনাথধাম পরিক্রমা করায় তীর্থযাত্রীদের মূল লক্ষ্য। প্রতিবছর শিবচতুর্দশীতে এ মন্দির পরিক্রমায় কষ্টের আঁকাবাঁকা পাহাড়িপথ পাড়ি দিয়ে চন্দ্রনাথ ধামে উঠে পূর্ণ্যার্থীরা। মেলায় চতুর্দশী তিথিতে ব্যাসকুণ্ডে স্নান-তর্পণ, গয়াকুণ্ডে পিণ্ডদান করে তীর্থ যাত্রীরা। এখানে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে রয়েছে বিরুপাক্ষ মন্দির, স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির, সতীর একান্ন পিঠের একটি শক্তিপীঠ ভবানী মন্দির, সীতা মন্দির, হনুমান মন্দির।
সমতলে রয়েছে ব্যসকুণ্ড ও ভৈরব মন্দির। এছাড়া শঙ্কর মঠ ও মিশন, ভোলানন্দ গিরি সেবাশ্রম, রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম ও সৎসঙ্গসহ সব মিলিয়ে অর্ধশত মঠ মন্দির রয়েছে। ধর্মীয় এ মেলাকে ঘিরে বসে তৈজসপত্র,পাঠ্যপুস্তুক, খাবারের দোকান, খেলনা, আসবাবপত্রসহ নানা পণ্যের দোকান। মেলায় আগত পূর্ণ্যার্থীরা ধর্মীয় আচার শেষ করে কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরেন।

ভোলানন্দগিরি সেবাশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী উমেশানন্দ গিরি বলেন, শিবরাত্রিতে শিবচতুর্দর্শী ব্রত রেখে ভক্তকূলকে শুরুতে আত্মাশুদ্ধ ও দেহ সূচি করে পাপমুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রত্যেক পূণ্যার্থীকে শুরুতেই ব্যসকুণ্ডে স্নান করতে হবে। এতে ইহজাগতিক পাপকার্য সমাপ্ত হয়। স্নানাদী সেরে দ্বারপাল ভগবান মহাকাল ভৈরবজীকে দর্শন করে তীর্থ শুরুর অনুমতি নিতে হয়।
এরপরই পূর্ণীর তীর্থের শুরু হয়ে গেল। এরপর পদব্রজে রওনা দিয়ে শুরুতে ভগবান রামচন্দ্রের মন্দির, মা সীতার মন্দির ও মহাবীর হনুমানজীর মন্দিরে গিয়ে দর্শন ও প্রার্থনা করা হয়। এরপর সতীপীঠ দেবী ভবানী মন্দির দর্শন ও পরিক্রমা করতে হয়। পরিক্রমা শ্রী স্বয়ম্ভুনাথজীর মন্দিরে অর্চনাদি করতে হয়। এরপর কিছু সময় সেখানে অপেক্ষা করে ভগবানকে স্মরণ করতে হয়। এরপর দেবী অন্নপূর্ণা, ভগবান নারায়ণ, ও কর্পন্দেশ্বর মহাদেব দর্শন করতে হয়।
শিপ্র/শাহোরা/