বাংলাদেশের রাজনীতি এখন নব্বই মিনিটের একটা ফাইনাল ফুটবল ম্যাচে এসে দাঁড়িয়েছে! সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী, সমর্থকরা এই সময়ে রাজনীতির দর্শক। খুব চিন্তায় পড়ে যাওয়ার অবস্থায় দেশের রাজনীতির হর্তাকর্তারা। গেলো চব্বিশের জুলাই ছিল এক অন্য রকম বাক বদলের খেলা৷ এবারের ম্যাচটা আরও অন্যরকম , এক কথায় দেখার মত! ম্যাচ ফিক্সিং এর এই যুগে এমন প্রানবন্ত খেলা কমই চোখে পড়ে । বিশেষ করে এই উপমহাদেশে এমনটা চোখে পড়াটা খুব স্বাভাবিক নয়। যেকেউ বলতে পারে নতুন খেলোয়াড় এসেছে! আর ভালো খেলোয়াড় মাঠে থাকায় দর্শকরাও আনন্দ পাচ্ছে আর রেফারি হিসেবে জনগনও নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছেন৷
যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিটি ফাউল ধরা পড়ে যাচ্ছে। এই ম্যাচটা যে কি অপূর্ব ইতিহাস তৈরি করতে পারে তা নিয়েই আলোচনা সর্বত্র। স্লোগান, মিছিল, হুটহাট পতাকা উঁচিয়ে তুলে ‘শোন মহাজন, আমরা অনেকজন’ বলা পরাশক্তি এই মাঠে বাড়ছে!
১৭ বছরের পুরো ১৭ বছরই কি আওয়ামী লীগ সীমাহীন অন্যায় করেছিল? কেমন ছিল তাদের শুরুটা? যতটুকু আমার মনে পড়ে, আস্তে আস্তে শুরু হয়েছিল। একটানা ১৭ বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আওয়ামী লীগকে জনগনের রক্তচোষার পর্ব চলছিল৷ একদিনে বা হুট করেই তারা এত বড় সাম্রাজ্য তৈরি করতে পারেনি। হঠাৎ একদিন বারুদের মতো বিস্ফোরিত হয় আগুন । জ্বালিয়ে দেয় অত্যাচারের তখতনামা। এরমধ্যে ঝড়ে যায় হাজারো তাজা প্রাণ! তবুও ত একটা শেষ হতে পারতো!
দেশের মানুষ যে বিএনপিকে এতদিন মজলুম হিসেবে ভালোবাসতো হঠাৎ সে বিএনপি জালিম হতে শুরু করলো। ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ পতনের দিন বিকেল থেকে শুরু, তারপর এ লেখা যখন লিখছি তখনোও জেলায়, উপজেলায় এমনকি ইউনিয়ন, ওয়ার্ডে তাদের দম্ভের ট্রেন চলতে থাকে, চলছেই! যদিও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার এ বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন তাতে কোন কাজই হয়নি। আমার বিশ্বাস, আমি হলফ করে বলতে পারি আওয়ামী লীগের মত ১৭ বছর সময় পেলে আমাদের বঙ্গোপসাগর শেষ করে
মায়ানমারের অর্ধেকটা দখল, কেনাবেচা করতে তাদের পুরো ১৭ বছর লাগবে না। এ লেখা লেখার দায়ে বিএনপি আমাকে কি বলবে আমি সেটা ভাবছি না ; আমি শুধু ভাবছি তারেক রহমান সাহেবকি আসলেই দলটায় একটা নিয়ন্ত্রণ আনতে পারবেন? হাজার হাজার আওয়ামী লীগ সমর্থক মিথ্যা ও গায়েবী মামলার স্বীকার হয়েছেন শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অপরাধে!এই ফাঁকে প্রকৃত দোষীদের অনেকেই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টাকা খেয়ে বিএনপি বুকে টেনে নিয়ে আওয়ামী লীগের দোষীদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। আর জেল ভরে যাচ্ছে ইউনিয়ন, ওয়ার্ডের ছোটখাটো নেতা, কর্মীদের দিয়ে! যাদের সাথে আওয়ামী লীগের নেতাদের ছবি আছে বাদ যাচ্ছে না তারাও!
ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে! শুধু যে বিএনপি এমনটা করছে তা নয়; অভিযোগ শোনা যায় এনসিপি, শিবিরের বিরুদ্ধেও। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রাটা কম। কোন কারণে ফের সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগ করার দায়ে যারা মিথ্যা সাজা পাচ্ছেন তারা কতটা ভয়ংকর হবেন তা ভেবে আমার ভয় হয় না। আমার ভয় বিএনপি, আওয়ামী লীগ এসব খেলায় সাধারণ জনগণের অবস্থাটা না জানি কেমন হয়?
ভালো মানুষেরা রাজনীতিতে না আসায় তার খেসারত বা কাফফারা আমাদের পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে। গেলো জুলাইয়ে হঠাৎ আমাদের বোধ জাগ্রত হয়, আমরা একটা ঐক্যবদ্ধ শক্তি হয়ে উঠি৷ ফ্যাসিজম বিলোপের শর্তে তৈরি হওয়া আমাদের ঐক্য বিনষ্ট হতে থাকে চাওয়া পাওয়ার দ্বন্দ্বে৷ ক্ষমতা দেখানোর লড়াইয়ে জিততে গিয়ে আমরা হারিয়ে দিতে থাকি পুরো দেশকে। আজ আমরা বহুধা বিভক্ত। এই বিভক্তি আরও পুক্তো হচ্ছে আমাদের চলমান রাজনৈতিক অসর্তকতার কারনে। ধরুন বিএনপির কথাই! গেলো সতেরো বছর যে পরিমাণ মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা তারা মজলুম হিসেবে পেয়েছে তা ধরে রাখলে দলটির খুব ভালো করতে পারতো। অথচ তাদের মনোযোগ চলে গেলো দখল বেদখলের ব্যবসায়! ফর্দটা অনেক লম্বা হবে মর্মে লম্বা ঘটনা সংক্ষিপ্ত করে একজন বিজ্ঞ বক্তার মত বলা যায় -‘ চাঁদার নেশায় চাঁদে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে যাচ্ছে তারা!’ যেখানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফিরবেন শোনা যাচ্ছে, সারাদেশে নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে সেখানে এই সময়ে বিএনপির বিরুদ্ধে স্লোগান নিয়ে নতুন প্রজন্ম সামনে।
তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে বিএনপি মাঠে একক জনপ্রিয়তা নিয়ে আগাতে পারতো। অথচ অবস্থা এতই খারাপ হয়ে যাচ্ছে যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ! মানুষ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খুঁজে নিতে চেষ্টা করছে৷ অথচ এই সময়ে বিএনপির বিকল্প হতে পারতো শুধুই বিএনপি!
বিএনপি এ পর্যন্ত কতজন নেতাকে বহিষ্কার করলো তার হিসেব নেই! অথচ এই বহিষ্কারের খুশি জনগন ত্যাগ করলো। বিএনপির বিরুদ্ধে জেলায় জেলায় মিছিল আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসা এটাই প্রমাণ করে। রাজনীতিতে কোন দৃষ্টান্ত বা নজির স্থাপন না করলে বিএনপিকে এর চরম মূল্য দিতে হতে পারে ।
সারাদেশে ছাত্রদলের একাধিক সাবেক ও বর্তমান নেতাকে পদত্যাগ করতে দেখলাম । এমনটা গত জুলাই এ ছাত্রলীগ থেকে করতে দেখেছি। নতুন প্রজন্ম কতটা মানবিক, সাহসী, প্রতিবাদী হলে এটা করতে পারে? মোড়ল হয়ে উঠা দলগুলো জনগণের থেকে কতটা দূরে সরে গেলে এমনটা হতে পারে? দলের হাইকমান্ড বলে কিছু থাকলে এসব নিয়ে তারা ভাববে৷
ময়লা রাজনীতি আর আবর্জনাকে সময়মত ডাস্টবিনে ফেলা দেওয়ার কথা আগেও বলেছি। এখন সে সময় বয়ে যায়! ছাত্র জনতার অংশগ্রহণে উজ্জীবিত নাগরিক বিপ্লবের শক্তিতে এখনই একটা রাজনীতি সচেতন বাংলাদেশের ভিত্তি প্রস্থর করা যেতে পারে। এমন সুযোগ সবসময় আসে না৷ রাজনীতিতে ভালো মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছেন দেশকে ভালোবাসে এমন সকলেই। ভয় আর সংশয়ের বেড়াজালে কেউ আবদ্ধ থাকতে রাজি নন। রাজপথে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সে বার্তা আগেই স্পষ্ট হয়েছে।
এখন নতুন দিনের রাজনীতির পথে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমূল পরিবর্তনের ডাক এসেছে জোড়ে সুরে! যে দলগুলো পরিবার কেন্দ্রীক রাজনীতির বাইরে ভাবতেও পারে না তারাও সংস্কারের সাথে তাল মেলাচ্ছে। তাল মেলাতে বাধ্য হচ্ছেন। একদম নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলেটাও নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন শুধুমাত্র স্বীয় গুণাবলির অধিকারে৷ লক্ষ লক্ষ জনতার উন্মুখ হয়ে থাকা রাজনীতির পথে দেশ। জি হুকুম জাহাপনা টাইপের চাটুকারেরা এখন আর জনগনকে সাতপাঁচ তেরো বুঝাতে পারছেন না! মুহুর্তের মধ্যে বিস্ফোরিত আগুনে সব ভণ্ডামিকে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
হাজার বছরে একবার যে সুযোগ আসে ঠিক তেমন একটা সুযোগ সমৃদ্ধ সময় পার করছে বাংলাদেশ ; আমরা। এই সময়কে তাজা রক্ত ঢেলে নিয়ে বসা হয়েছে। যে তরুণরা এখন রাজপথে আছেন, রাজনীতিতে আছেন তাদের কে আর ঘরে ফিরতে দেওয়া যাবে না। আমাদের রাজনীতির রাজপথে তাদেরকে খুব প্রয়োজন। একটা তারুণ্য নির্ভর, মেধাভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির, জনগনের জন্য, গণমুখী, কল্যাণমুখী রাজনীতির সময় বহিয়া যায়! আসুন লাল কার্ড বের করি ; ছুড়ে মারি অসুস্থ রাজনৈতিক নেতাদের মুখে। আমাদের এখন এভাবেই জবাবদিহিতা ভিত্তিক অগ্রযাত্রার সময়। চা, সিগারেটের বিনিময়ে ভোটের বিরুদ্ধে মূল্যবোধ ভিত্তিক রাজনীতি ও ভোট ব্যবস্থার যে সুযোগ তাকে এত সহজে হাতছাড়া হতে দিলে আমরাই ছিটকে পড়বো ডাস্টবিনে!
লেখক : মো.মাহবুব আলম
ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক, জনতার দল কেন্দ্রীয় কমিটিG