
মো. শাহাদাৎ হোষেন রাজু
দেশের সনাতন ধর্মালম্বীদের সবচেেয়ে ধর্মীয উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা শুরু হয়েছে। পুরানে আছে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আদল ফুটিয়ে তুলতে কয়েকটি জিনিসের সংমিশ্রণ অত্যাবশ্যক। যেমন, গোমূত্র, গোবর, ধানের খড়, পবিত্র গঙ্গার জল আর নিষিদ্ধপল্লীর মাটি এগুলোর মিশ্রণে তৈরি হবে দেবীমূর্তি৷ আর এই কারণেই সেই পুরাকাল থেকে আজও দেবীর মূর্তি তৈরিতে দরকার হয় বেশ্যা বা পতিতালয়ের মাটি৷ কিন্তু কেন এই রীতি? সমাজ যাঁদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, অবজ্ঞা আর বঞ্চনার পাহাড় জমে উঠেছে যাঁদের দেওয়াল বেয়ে, ঘৃণা আর নোংরা দৃষ্টি ছাড়া যাঁদের ভাগ্যে আর তেমন কিছুই জোটেনি, তাঁদের ঘরের মাটিই আবার দেবীমূর্তির অপরিহার্য অঙ্গ হলো কেন?
একটা পুরুষ যখন পতিতার বাড়ি গিয়ে অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হয় তখন ওই পুরুষের জীবনের সমস্ত পূণ্য পতিতার বাড়ির মাটিতে পতিত হয় বা পূণ্য তাকে ত্যাগ করে, বিনিময়ে ওই পুরুষ পতিতার ঘর থেকে নিয়ে আসে তাঁর সমস্ত পাপ। এরূপ বহু পুরুষের অর্জিত সমস্ত পূণ্য ত্যাগে পতিতাদের ঘরের মাটি পূণ্যময় হয় বলে শাস্ত্রীয়ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাই পতিতার ঘরের পবিত্র মাটি প্রয়োজন হয় দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরীতে।
দেবী দুর্গা কে?
দেবদ্রোহী মহিষাসুর নামে অসুরকে ব্রহ্মা না-কি বর দিয়ে ফেলেছিলেন যে, কোনও পুরুষ তাকে বধ করতে পারবে না। এরপর সে মনের আনন্দে দেবতাদের ওপর সীমাহীন অত্যাচার শুরু করলে ভোগবাদী বৈদিক দেবতারা অবশেষে স্বর্গচ্যুত হন। উত্ত্যক্ত, ব্যতিব্যস্ত হৃতরাজ্য দেবতারা দেখলেন, অতিসত্বর এর একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার। তারা নিজেরা কেউ এই দানবের সাথে লড়তে পারবেন না, তার বদলে প্রবল শক্তিশালিনী এক নারীকে সৃষ্টি করতে হবে। তখন অনেকেই তাদের তেজের অংশ দান করলেন।
শিবের তেজে হল মুখ, বিষ্ণুর তেজে দশটি বাহু, চন্দ্রের তেজে দুই স্তন, ইন্দ্রের তেজে কোমর, বরুণের তেজে জঙ্ঘা ও উরু, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পদযুগল, বসুগণের তেজে আঙুল, কুবেরের তেজে নাক, প্রজাপতির তেজে দাঁত, সন্ধ্যার তেজে দুই ভুরু ও পবনের তেজে দুই কান। এই গঠন প্রক্রিয়ায়ও বেশ একটা কৌতূহলী দিক আছে, এ যেন হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা বিশিষ্ট্য একটি পুতুল তৈরীর ধারাবাহিক ক্রিয়া। দেবতারা পরে তাঁদের নিজেদের অস্ত্রশস্ত্রও এই দেবীকে দান করেন, তাই সমর প্রশিক্ষিতা দেবী একাধিক অস্ত্রে সজ্জিত।
সমস্ত দেবতার ‘অবদান’ রয়েছে এই নারীমূর্তির গঠনে, এই বার্তাটিকে বাঁকিয়ে-চুরিয়ে দুর্গাকে বহুদেবতাভোগ্যা স্বর্গবেশ্যা বলে ব্যাখ্যা করে হাল্লা মাচিয়ে দিয়েছেন একদল সমাজতত্ত্ববিদ। তবে কি সকল দেবতা এই প্রতারক এবং ছলনাময়ী দুর্গা দেবী তৈরীতে কোন এক সুন্দরী আর্য নারীর সাথে পর্যায়ক্রমে যৌন সংশ্রবে মিলিত হয়ে তাকে তেজ প্রদান করে কাল্পনিক দেবত্বের মর্যাদা দিয়ে ছিলেন, সোজা বাংলায় একাধিক পুরুষের সাথে মিলিত হলে প্রচলিত সমাজে যাকে পতিতা বা বেশ্যা বলে গণ্য করা হয়? তাহলে দুর্গাপুজার আড়ালে কি এমনই কোন ছলনাময়ী প্রতারক হন্তারক পতিতা দেবীরই পুজো করা হচ্ছে? আর মূলনিবাসী অসুর সম্প্রদায়কে দেখানো হচ্ছে অত্যাচারী, দেবদ্রোহী, বেদবিরোধী অযাজ্ঞিক অধার্মিক হিসাবে।
শতপথ ব্রাহ্মণ বলছে “যজ্ঞেন বৈ দেবাঃ” যারা যজ্ঞ করতেন তারা দেব। দেবতা কথার অর্থ বিদ্বান ব্যক্তি, বিদ্যাংসো হি দেবাঃ অর্থাৎ, বিদ্বান তিন প্রকার দেব, ঋষি, পিতৃ।
অসুর শব্দের অর্থ বীর, যোদ্ধা, জাজ্বল্যমান। অসুর হলো সুরের বিপরীত যারা সুরা পান করেনা। অসুর কোন নিন্দা সূচক শব্দ না, ঋগ্বেদে বহুবার প্রশংসা সূচক অভিবাদন স্বরূপ ইন্দ্র, সূর্য, বরুণকেও অসুর সম্ভাষণ করা হয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে যে দেবাসুরের সংগ্রামের কথা পাই, সেটা বাস্তবে অবৈদিক শক্তির সাথে বৈদিক প্রজ্ঞার এক পৌরাণিক লড়াই ছিল, যেখানে চতুর বিদ্বানরা ছলা-কলা-প্রতারণার মাধ্যমে জয় লাভ করে ছিল, আর প্রতিরোধী বীর যোদ্ধা অসুরেরা পরাজিত হয়ে আর্যবর্ত ত্যাগ করে পশ্চিমে আসিরিয় সভ্যতা স্থাপন করেছিল অথবা প্রাচ্যদেশে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ ইতিহাস বিকৃতির ফলে দেবতা বলতে অপার্থিব এক মহান শক্তি ও অসুর বলতে অদ্ভুত অত্যাচারী কিছু অমানবের প্রতিচ্ছবিই বোঝানো হচ্ছে।
আসলে দেব বা অসুররা আমাদের মতই রক্তমাংসের মানুষ ছিল, কেউ আকাশ হতে ঐশীশক্তি নিয়ে কখনও নেমে আসেনি। এরা দুইদল ভারতেরই দুইটি সুপ্রাচীন আর্য জাতি, কেউ আল্পিয় আর কেউ নর্ডিক। তবে একদল যাজ্ঞিক, আর অন্যদল বৈদিক যজ্ঞ রহিত। বেদে ১০৫ বার অসুর শব্দের উল্লেখ আছে। তার মধ্যে ৯০ বারই প্রশংসা সূচক। যেমন অসুরঃ অসু ক্ষেপণে শত্রুণ্ ইত্যসুরঃ। যারা শত্রুদের উপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে পটু তারা অসুর। এবং অসুন্ প্রাণান রাতি দদাতি ইত্যসুরঃ। যারা প্রাণদান করে, যাদের মধ্যে দুর্দমনীয় প্রাণশক্তির প্রকাশ দেখা যায়, সেই সমস্ত শক্তিশালী বীররাই অসুরপদবাচ্য।
ড: নীহার রঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস ’ গ্রন্থেও এ কথা স্বীকার করেছেন। বৈদিক যুগে আর্যরা বিহারের মিথিলা পর্যন্ত দখল করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত তারা পূর্ব-ভারতের আলপাইন মানবগোষ্ঠীর অসুর জাতির কাছে বারবার পরাজিত হয়ে পূর্বভারত দখলের যাবতীয় স্বপ্ন একসময় ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ এই অসুর জাতির যেমন ছিল এক বিশাল হস্তিবাহিনী তেমনি ছিল তাদের শক্তিশালী এক রাজতন্ত্রও। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে(১/১৪) এই অসুর জাতির রাজতন্ত্রের মধ্যে একমাত্র প্রাচ্যদেশেই এই একরাট বা সম্রাট ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। যেহেতু অসুর রাজতন্ত্রের সর্বাধিনায়ককে সম্রাট বলা হত সেহেতু বৌদ্ধ যুগে অসুর জাতির বংশধর হিসাবে সম্ভবত মৌর্য শাসকদের সর্বাধিনায়কের উপাধিও ছিল সম্রাট। তবে সুচতুর নর্ডিক আর্য ব্রাহ্মণেরা পরাজিত আলপাইন অসুর জাতির লোকদের দেবতার ভয়ে ভীত করে চিরদিনের মত দাবিয়ে রাখতে তাদেরই সৃষ্ট ছলনাময়ী সুচতুর অসুর হন্তারক নারী দুর্গাকে কাল্পনিক দেবী আখ্যায়িত করে দুর্গার আবির্ভাব ঘটিয়ে- এই অসুরদের রাজত্ব বঙ্গদেশে ব্যাপকভাবে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন; যা ভারতবর্ষের আর কোন রাজ্যে তেমন দেখা যায় না। কাল্পনিক দেবত্ব প্রদত্ত এই দুর্গার আসরে অসুরদের এমন ভাবে তারা অত্যাচারী এবং অশুভ শক্তির ধারক ও বাহকরূপে প্রকাশ করেন যাতে ভবিষ্যতে কোন বাঙালি যেন ঘৃণা ভরে কোনদিনও জানতে না চান যে, আসলে তারাই হল আলপাইন অসুর জাতির মানুষ, আর ব্রাহ্মণেরা বহিরাগত দখলদার নর্ডিক আর্যজাতি।
এবার ফিরে আসা যাক পতিতা প্রসঙ্গে, পতিতাদের কদর এবং উদাহরনও হিন্দু পুরাণে ভুঁড়ি-ভুঁড়ি! তাছাড়া হিন্দু পুরাণে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে, পতিতাদের ক্ষমতা নাকি দেবতা বা বৈদিক বিদ্বান নেতাদের থেকেও বেশী। কালীদাস রচিত শকুন্তলায় আছে- বিশ্বামিত্র ঋষি ইন্দ্রত্ব লাভের আশায় গভীর তপস্যা করছিল। তখন ইন্দ্র ভীত হয়ে কৌশলে মেনকাকে পাঠায় বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভঙ্গ করার জন্য। মেনকা সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে বিশ্বামিত্রের সামনে যায়, ফলে বিশ্বামিত্র তপস্যা ভুলে মেনকার সাথে যৌন-ক্রিয়ায় মিলিত হয়। এই মিলনের ফলে শকুন্তলার জন্ম হয়। দেবরাজ ইন্দ্র সর্বশক্তিমান হয়েও আদৌ যা করতে পারলেন না, মেনকা সামান্য নারী হয়ে ছলনার মাধ্যমে তা অবলীলায় করে ফেলল!
তেমনি এই দুর্গা চরিত্র, নোংরা কাম-কলা ছলনার দ্বারা বীর মহিষাসুরকে নিরস্ত্র করে হত্যা করে। ঋগ্বেদের ১.১০৮.৮ শ্লোক অনুযায়ী জানা যায়, নর্ডিক আর্য গোষ্ঠী গুলির মধ্যে পাঁচটি মূল গোষ্ঠী, যেমন-পুরু, যদু, তরবাসা, অনু এবং দ্রুহয়ু- এর সাথে অনার্য বীর রাজা মহিষাসুরের বারবার যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে এই আর্য গোষ্ঠীগুলি বেশ কয়েকবার পরাজিত হলে তারা একত্রে বসে পরামর্শ করে নৃত্য -গীতে পারদর্শী সুন্দরি কামিনী-নারী দুর্গাকে মহিষাসুরের কাছে পাঠায়। কারণ অসুরজাতি কোন নারীকে আক্রমণ করত না।
কিন্তু শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুসারে, মহিষাসুর স্বয়ং দেবীর সাথে যুদ্ধ শুরু করলেন। যুদ্ধকালে ঐন্দ্রজালিক মহিষাসুর নানা রূপ ধারণ করে দেবীকে ভীত বা বিমোহিত করার প্রচেষ্টায় রত হলেন; কিন্তু দেবী বিমোহনের সেই সকল প্রচেষ্টা কৌশলে ব্যর্থ করে দিলেন। তখন অসুর অহঙ্কারে মত্ত হয়ে প্রবল গর্জন করে উঠলে, দেবী বললেন, – রে মূঢ়, যতক্ষণ আমি মধুপান করি, ততক্ষণ তুই গর্জন করে নে। আমি তোকে বধ করলেই দেবতারা এখানে শীঘ্রই গর্জন করবেন’। কিন্তু অসুরেরা-তো কোন নারীর সাথে যুদ্ধ করে না। অসুর নাকি দৈত্যরাজ! তা, সে অমন খালি গায়ে মাসল বের করে যুদ্ধ করতে এসেছে কেন? রাজমুকুট, শিরস্ত্রাণ, বর্ম, অলঙ্কার কই? তাহলে নিরস্ত্র অর্ধনগ্ন শরীরের অসুর থেকে দেবী যুদ্ধক্ষেত্রে কী এমন মধুপান করছেন?
এরপরে মধুপান শেষে দেবী লম্ফ দিয়ে মহিষাসুরের উপর চড়ে তাঁর কণ্ঠে পা দিয়ে শূলদ্বারা বক্ষ বিদীর্ণ করে তাকে বধ করলেন। অসুরসেনাগণ হাহাকার করতে করতে পলায়ন করল এবং দেবতারা স্বর্গের অধিকার ফিরে পেয়ে আনন্দধ্বনি করতে লাগলেন।
মূলত রাজা মহিষাসুর দেবীর ছলনায় যখন নিজ অস্ত্র ত্যাগ করে শয়ন কক্ষে যান, ঠিক তখন-ই নিভৃত ঘরে ছলনাময়ী-কামিনী দুর্গা তাকে ত্রিশূলবিদ্ধ করে হত্যা করে আর্যদের গৌরবময় বিজয় গাঁথা রচনা করেছিল। নারী ছিল একমাত্র দুর্বলতা- এই অমিত শক্তিধর অনার্য (না কি, অস্ট্রিক?) পুরুষের। কতটা দুর্বল হয়েছিলেন তিনি, অতসীপুষ্প-বর্ণাভা সুপ্রতিষ্ঠা সুলোচনা সুচারুদশনা পীনোন্নতপয়োধরা সেই অলোকসামান্যা যৌবনবতীর প্রতি? কতটা প্রণয়মথিত হলে তবে, সমস্ত সৈন্য-সেনাপতির নির্মম নিধন স্বচক্ষে দেখেও, রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে সেই নিহন্ত্রীর কাছেই কাম নিবেদন করা যায়? দুর্গা পূজামন্ডপে যেমন দেখতে পাই, এই ছলনাময়ী নারী দুর্গা অসুরদের বীরসম্রাট মহিষাসুরের বুকে ত্রিশূল দিয়ে বিঁধে, বুকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার অনুগত অন্যান্য হিংস্র পশুরা তাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে। যখন শূলবিদ্ধ অসুরকে দেখি, দীনের মতো দেবীর পদতলে রক্তলিপ্ত, মুমূর্ষু- অথচ অপলক দৃষ্টিখানি অবধারিতভাবে নিবদ্ধ দেবীর মুখের দিকে- মনের মধ্যে তখন কতরকম ভাবনাই যে চমকে ওঠে! ওই দৃষ্টির কতরকম অর্থই না খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই বৈদিক বামুনেরা দলিত ও অন্যান্য পশ্চাদপদ শ্রেনীর মানুষের উপর ছলে-বলে-কলে-কৌশলে ব্রাহ্মন্যবাদী সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়েছে এবং মূলনিবাসীদের আদি সংস্কৃতি পুরোপুরি নৃশংসভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে অনেকেই নিজেদের উৎস ও অতীত ইতিহাস ভুলে গিয়ে আজ বৈদিক আর্য-বেশ্যা দুর্গাকেই মাতৃজ্ঞানে বন্দনা করে চলেছেন।
অথচ হিন্দু সমাজে এই বেশ্যাদের বেশ কদর ছিলো বরাবরই। কারণ ওই যে, দেবতাদের চেয়েও পতিতার শক্তি বেশী। উল্লেখ্য ব্রিটিশ আমলে পতিতাদের জন্য এই কলকাতা শহরও কিন্তু ছিল খুব বিখ্যাত। ব্রিটিশদের হস্তগত করতে পতিতার প্রলোভন দেওয়া হয়, তাই বাংলায় পুনরায় পতিতাদেবী দুর্গা পূজোর বহুল প্রচলন শুরু হয় এই ব্রিটিশ আমলেই। বহিরাগত মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে কোনক্রমে পেরে না ওঠা অবস্থাপন্ন হিন্দু জমিদারগণ অবশেষে পতিতাদেবীর পুজো আয়োজনের ব্যতিব্যস্ততা অন্তত তাই প্রমাণ করে। বিখ্যাত(!) পতিতালয় সোনাগাছি-তো এই শহর কলকাতাতেই অবস্থিত। এ সম্পর্কে ইতিহাস বলে-
“কলকাতায় খুবই রমরমা ছিল বেশ্যাদের জগৎ। গৃহস্থের বাড়ির পাশে বেশ্যা, ছেলেদের পাঠশালার পাশে বেশ্যা, চিকিৎসালয়ের পাশে বেশ্যা, মন্দিরের পাশে বেশ্যা”। [তথ্যসুত্র: বিনয় ঘোষ, কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৩০২-০৩]
“বিশেষ করে রামবাগান, সোনাগাছি, মেছোবাজার, সিদ্ধেশ্বরীতলা, হাড়কাটা, চাঁপাতলা, ইমামবক্স এগুলো ছিল বেশ্যাদের আখড়া”। [তথ্যসুত্র: বিশ্বনাথ জোয়ার্দার, পুরনো কলকাতার অন্য সংস্কৃতি, ২০০৯, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৮]
“পতিতারা শহরে প্রকাশ্য রাজপথে নৃত্যগীত পর্যন্ত করত। কলকাতার পুলিশ ধনীদের তৈরি বেশ্যালয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে সাহস পেত না। শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা, দ্বারকানাথ ঠাকুর কলকাতার একটি এলাকাতেই তেতাল্লিশটি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলো”। [ তথ্যসুত্র: সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, ১৯৬২, পৃষ্ঠা ৩৫৮-৬০]
“বেশ্যাবাজি ছিল উচ্চবর্ণ বাবু সমাজের সাধারণ ঘটনা। নারী আন্দোলনের ভারত পথিক রাজা রামমোহন রায়েরও রক্ষিতা ছিল। এমনকি ওই রক্ষিতার গর্ভে তাঁর একটি পুত্রও জন্মে ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিতা সুকুমারী দত্তের প্রেমে মজে ছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজেও নিয়মিত পতিতালয়ে গমন করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পতিতালয়ে যেতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। নিষিদ্ধ পল্লীতে গমনের ফলে রবীন্দ্রনাথের সিফিলিস আক্রান্ত হওয়ার খবর তাঁর জীবদ্দশাতেই ‘বসুমতী’ পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল”।
[ তথ্যসুত্র: অবিদ্যার অন্তঃপুরে, নিষিদ্ধ পল্লীর অন্তরঙ্গ কথকতা; ড. আবুল আহসান চৌধুরী : শোভা প্রকাশ]
শিপ্র/শাহোরা/