নিজস্ব প্রতিবেদক
অষ্টম জাতীয় ভোটার দিবস আজ ২ মার্চ। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য–‘ভোটারদের শক্তি, গণতন্ত্রের মুক্তি’। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চার দফা হালনাগাদের পর দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত ১৬ বছরেই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাওয়া এবং ১৮ বছরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকাভুক্তির সুযোগ নতুন প্রজন্মকে আরও উচ্ছ্বসিত করেছে। তরুণদের প্রত্যাশা, ভোটারদের শক্তি যেন কোনো অপশক্তির কাছে পরাজিত না হয়। প্রান্তিক বা সংখ্যালঘু ভোটারদের দাবি, ভোটকেন্দ্রিক কদর নয়, নাগরিক হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটব্যবস্থা ছাড়া পূর্ণ গণতন্ত্র সম্ভব নয়। কারণ ভোট কেবল সংখ্যা নয়, এটি নাগরিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক নিশ্চয়তার প্রতীক। আর ভোটারদের আস্থা অর্জনকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছে ইসি।
দিবসটি উপলক্ষে প্রথমে প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হলেও পরে রমজানের কারণে কেন্দ্রীয়সহ সব কর্মসূচি স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। র্যালি, আলোচনা সভা ও এনআইডি বিতরণ কর্মসূচি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। কারণ স্পষ্ট না হলেও এই সিদ্ধান্তে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আনুষ্ঠানিক আয়োজনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দিবসের প্রতিপাদ্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভোটাধিকার প্রয়োগ হবে অবাধ, ভয়হীন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে।
তরুণদের স্বীকৃতি: ১৬ বছরে এনআইডি
তরুণদের ভোটার হতে উৎসাহিত করতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ইসির সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হলো–১৬ বছর পূর্ণ হলে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) আবেদন করা যাবে, আর ১৮ পূর্ণ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় নাম উঠবে। এই ঘোষণা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে, ভোট নিয়ে বেড়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা। রাজধানীর বাংলামোটরে একটি কফিশপে কাজ করে কিশোর মো. আলবান (১৭) তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে। সপ্তম শ্রেণিরর পর আর পড়া হয়নি এই কিশোরের। তাকে জিজ্ঞেস করি– তুমি কি জানো ১৬ বছরেই তুমি আবেদন করে এনআইডি পাবে। আলবান বলে, ‘জানি আপা। তবে গত বছর যখন তথ্য নিয়েছে তখন আমি দিতে পারিনি। ভাবছি এবার আবেদন করেই এনআইডি নেব। ভোটার হলে বড়দের মতো আমিও ভোট দিতে পারব।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সজীব আহমেদ প্রথমবার ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলেন, ‘ভোটের মাধ্যমে মত প্রকাশ করতে পেরে ভালো লেগেছে। বড়দের কাছে শুনেছি, অনেক সময় ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি। আমি চাই, মানুষ যেন আর কখনো তার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। এ দেশের মানুষের ভোটের অধিকার আর যেন ভূলুণ্ঠিত না হয়–রাজনৈতিক নেতারা সেই ব্যবস্থা করুন।’
ভোটার হালনাগাদ ও পরিসংখ্যান
ইসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদের অন্তর্ভুক্ত করে এবার চার দফা ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়। চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ১২০ জন।
বিশেষজ্ঞের মন্তব্য
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলীর মতে, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হলেও সেটিই চূড়ান্ত নয়; প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেওয়া। তিনি বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটব্যবস্থা না হলে পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে সংবেদনশীলতা ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বঞ্চিতই থেকে যায়।’ তার মতে, সংখ্যার ঊর্ধ্বে অধিকার, প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা জরুরি। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।
ইসির প্রত্যাশা
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ করার চেষ্টা চলছে, তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ভোটারদের আস্থা নিশ্চিত করা। বিগত নির্বাচনে সেই চেষ্টা আমরা করেছি। কারণ ভোটার সংখ্যা বাড়লেই হবে না, মানুষ যেন নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন–সেই পরিবেশ আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’ তিনি জানান, তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে; এ জন্য মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের আরও সংবেদনশীল ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিপ্র/শাহোরা/