প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও ঝরে পড়া রোধে দেশের ১৫০টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং বা ‘মিড ডে মিল’ কার্যক্রম চালু করেছে সরকার। নরসিংদীর ৬টি উপজেলাতেও চলছে এ কর্মসূচি। নিম্নমানের খাবার ও অনিয়মের কারণে চালুর ৪র্থ দিনেই কার্যক্রমটি জেলার সর্বত্র বন্ধ থাকে। পরে গত রবিবার থেকে আবার চালু হওয়া পর বেলাব উপজেলাজুড়ে খাবারের মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে মানসম্মত খাবার সরবরাহ হওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সন্তুষ্টি দেখা দিয়েছে। ফলে সর্বত্র প্রশংসায় ভাসছে সরকারি এই কর্মসূচি।
বেলাব উপজেলার ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৪ হাজার ৮৬০ শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিনই খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতের পাশাপাশি পড়াশোনায় আগ্রহও বেড়েছে।
গত ১৭ নভেম্বর দেশব্যাপী পাইলট প্রকল্প হিসেবে মিড-ডে মিল চালু করে সরকার। প্রকল্পের শুরুতে কিছু অনিয়ম থাকলেও বর্তমানে বেলাবতে এ কার্যক্রমর খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান —— মানসম্মত খাবার সরবরাহে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বেলাব উপজেলায় নিয়মিত মানসম্মত খাদ্য সরবরাহের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। তাদের মতে, কার্যক্রমটি চলমান থাকলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় জানায়, শুরুতে সরবরাহকৃত খাবারের মান খুব একটা ভালো ছিল না। তবে বর্তমানে স্বাস্থ্যকর ও মানসম্মত খাবার দেওয়া হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সঠিক তদারকিতে স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকরা একসঙ্গে কাজ করছেন।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জুলেখা শারমিন বলেন, “মানসম্মত খাবার দেওয়ার কারণে অনেক স্কুলেই ছাত্রসংখ্যা বেড়ে গেছে। ফলে কোথাও কোথাও সাময়িক খাবার সংকট তৈরি হয়। শতভাগ খাবার নিশ্চিত করতে আমরা ইতোমধ্যেই রিপোর্ট পাঠিয়েছি।”
বেলাব মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি নাসির উদ্দিন বলেন, “এই কর্মসূচির কারণে ঝরে পড়া প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। যারা আগে সন্তানকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে অনাগ্রহী ছিল, তারাও এখন ভর্তি করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এতে ভর্তি হার বাড়বে এবং শিক্ষা ব্যবস্থা আরও সমৃদ্ধ হবে।”
এ কার্যক্রম শুধু পুষ্টিই দিচ্ছে না—স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য অপচয় রোধে শিক্ষার্থীদের সচেতনও করছে।
অভিভাবকেরা বলছেন, প্রতিদিন সন্তানের নাস্তার খরচ অনেক পরিবারের জন্যই কষ্টসাধ্য। স্কুল ফিডিং কার্যক্রম তাদের সেই চাপ কমিয়েছে। বেঁচে যাওয়া অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করতে পারছেন তারা। ফলে শিশুরা এখন নিজেরাই স্কুলে যেতে আগ্রহী হচ্ছে।
বেলাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, “স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বেলাবের প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, প্রতিটি শিশু পুষ্টিকর খাবার পেয়ে নিয়মিত স্কুলে আসে।”
কার্যক্রমের কারণে বহু বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার এতটাই বেড়েছে যে অনুপস্থিতির হার প্রায় শূন্য। তবে প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী ৯০ শতাংশ খাবার সরবরাহ করায় কিছু বিদ্যালয়ে খাবার সংকট দেখা দেয়। শিক্ষক-অভিভাবকেরা শতভাগ খাবার নিশ্চিতে দাবি জানিয়েছেন।
কিছু স্কুলে খাবার পৌঁছাতে দেরি হওয়া, এবং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেছেন শিক্ষকরা।
তবুও সার্বিকভাবে বেলাব উপজেলার মানুষ মনে করেন—ব্যবস্থাপনা আরও মজবুত করা গেলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখবে।
শিপ্রা/শাহোরা/