শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:২৮ পূর্বাহ্ন

সারাদেশে তীব্র শীতে বেড়েছে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত রোগ

Reporter Name / ৭৮ Time View
Update : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক 

দেশের চারটি বিভাগ ও ১২ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এতে জনজীবন অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।  দেশের ।বিভিন্ন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ায় শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশিসহ নানা অসুখে প্রতিদিনই হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর ভিড় বাড়ছে।

আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, পৌষের শেষ এসে জেঁকে বসা শীতে বুধবার নওগাঁর বদলগাছিতে মৌসুমের সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এটি অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া সারা দেশে কুয়াশার দাপট থাকবে বলেও আভাস দিয়েছে সংস্থটি।

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লা জেলা এবং রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে আগামী কয়েকদিন। তীব্র শীতের অনুভূতি আরও দুদিন থাকতে পারে। এরপর তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে, ফলে শীতের অনুভূতি কমবে। সবশেষ বুধবার দেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে এক ঝলক রোদের দেখা মিলছে। তবে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে কুয়াশা ছিল। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কুয়াশার এমন পরিস্থিতি থাকবে। এরপর কুয়াশা কিছুটা কাটতে পারে, শনিবার শীতের অনুভূতি কিছুটা কমতে পারে। তবে শীত পুরো জানুয়ারি মাসজুড়েই থাকবে।

এদিকে, তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ। যাদের বেশির ভাগকেই খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয়। যশোর শহরের বিভিন্ন শ্রমবাজারে প্রতিদিন যেখানে ৩০০-৪০০ মানুষ কাজের আশায় জড়ো হন, কাজকর্ম কম থাকায় সেখানে এখন সেই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেকেই সকাল থেকে অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।

রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও দিনমজুররা জানান, বেশি শীতের কারণে লোকজন ঘর থেকে কম বের হচ্ছে। নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ তেমন হাতে নেওয়া হচ্ছে না। এতে তাদের কাজ কমে গেছে। কিন্তু আয় কমলেও সংসারের ব্যয় তো কমছে না। একই চিত্র বিভিন্ন জেলায়।

রংপুর মেডিক্যালে ঠান্ডাজনিত রোগে ২০ দিনে ১৬ জনের মৃত্যু

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে গত ২০ দিনে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ৯ ও বয়স্ক নারী-পুরুষ সাত জন।

চিকিৎসকরা বলছেন, রংপুরে শীত মৌসুমে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই শিশু ও বৃদ্ধ।

হাসপাতালের শিশু বিভাগ সূত্র জানায়, তিনটি ওয়ার্ডে ১২০ শয্যার বিপরীতে বুধবার পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ২৫৭ জন। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি আছেন ৩৪ জন।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, রোগীতে ঠাসা মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ড। অনেক রোগীর চিকিৎসা চলছে হাসপাতালে মেঝে ও বারান্দায়।

রংপুরের হারাগাছ পৌরসভার কেয়া মনির (২০) দুই মাস বয়সী মেয়ে মুনতাহাও নিউমোনিয়া আক্রান্ত। কেয়ার মা নুরী বেগম বলেন, ‘সূর্য দেখা যায় না। রাইতোত ঝড়ির মতো টিনের চাল দিয়া শীত পড়ে। হামরা গরিব মানুষ। ল্যাপ (লেপ), তোশক নাই। বাচ্চা ছোয়া নিয়্যা চিন্তায় আছি।’

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, ‘শীতে সব সময় ঠান্ডাজনিত রোগ বাড়ে। শীতকালে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, বিশেষত ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া ও অ্যাজমার রোগী বেশি আসেন। এবারও চাপ আছে। এ ছাড়া শীতের সময় রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া হয়। কয়েক দিন আগে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি থাকলেও এখন কমেছে।’

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান জানান, তাদের ছয়টি ইউনিটে শয্যার সংখ্যা ১৩৫। তবে গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী ভর্তি থাকেন। শীতজনিত রোগের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, স্ট্রোকজনিত রোগ বেশি হচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যা খুব বেশি নয়। অন্য সময়ের মতো স্বাভাবিক।

যশোরে বেড়েছে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা

যশোরে শৈতপ্রবাহের তীব্রতা বাড়লেও তিন দিন পর বুধবার সূর্যের দেখা মিলেছে। রোদের উত্তাপে হাড়ের কাঁপন কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও ছিন্নমূল মানুষ এই শীতে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। বুধবার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মঙ্গলবার ভোরে যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবার ভোরে যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ১২ দিন ধরেই এই জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে অবস্থান করছে। এই মৌসুমে চারদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ ডিগ্রি থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়ামের মধ্যে নেমে আসলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ দশমিক ১ ডিগ্রি থেকে ৮ ড

একই কথা বলেছেন ধর্মতলা এলাকার বাসিন্দা রিকশাচালক আলী হোসেন। তিনি বলেন, ‘দুপুর বেলায় রিকশা নিয়ে বের হয়ে যে কয় টাকা আয় হচ্ছে। তাই নিয়ে সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। শীতে রাস্তা ঘাটে মানুষ কম বের হচ্ছে। তাই ভাড়াও কম পাওয়া যাচ্ছে। আর সকাল ও রাতে তো ভাড়াই পাওয়া যাচ্ছে না।’

শংকরপুর এলাকার গৃহবধূ ইয়াসমিন আক্তার জানান, ‘সন্ধ্যা রাতেই রেলগেট থেকে শংকরপুর যাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় রাস্তায় কোনও রিকশা মেলেনি। শীতের কারণে রাতে রাস্তায় মানুষ চলাচলও অনেক কমে গেছে।’

সাতক্ষীরায় তাপমাত্রা নেমেছে ৮ ডিগ্রিতে

শীতের দাপটে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরার জনজীবন। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা। তবে জীবিকার তাগিদে শীত উপেক্ষা করে কাজে বের হতে হচ্ছে তাদের।

সাতক্ষীরার আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলতি মৌসুমে বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকালে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পুরো জানুয়ারি মাসজুড়ে এই রকম আবহাওয়া থাকবে। ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের দেখা মেলেনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এই জেলায়। ফলে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।’

শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডাজনিত রোগীও বাড়ছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক রিয়াদ হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তীব্র শীতে শিশুদের প্রতি বাড়তি সতর্কতা জরুরি। হাত-পায়ে মোজা পরানো, শরীর গরম কাপড়ে ঢেকে রাখা এবং বাসি খাবার এড়িয়ে চলার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি পান নিশ্চিত করতে হবে। একই ধরনের সতর্কতা বয়স্কদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’

শীতার্তদের সহায়তায় প্রশাসন ও বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন। আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন এমন থাকলে দুর্ভোগ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তীব্র শীত মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতভর শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার নিজে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শীতার্ত মানুষের বাড়ি বাড়ি কম্বল বিতরণ ও কার্যক্রম তদারকি করছেন।

জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে পাঁচ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

নীলফামারীতে শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

তীব্র শীতে শিশু থেকে বয়স্ক, সবাই পড়েছেন বেকায়দায়। গরম কাপড় মুড়ি দিয়ে চলাচল করছেন পথচারীরা। দিনের বেলায় হেড লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।

ডিমলা আবহাওয়া অফিসের সহকারী কর্মকর্তা এমডি আব্দুস সবুর মিয়া জানান, এমন শীত আরও কয়েকদিন থাকতে পারে।

ডিমলা খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের খগাখড়িবাড়ী গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল মজিদ জানান, ‘হামরা (আমরা) ভারতের হিমলায়ের কাছাকাছি থাকি। এজন্য এঠে প্রচুর ঠান্ডা হয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়ের বমি, সর্দি, কাশি তো লাগি আছে। বিশেষ করে গরিব মানুষ কাহিল হয়ে পড়েছে। সরকারিভাবে শীতে দু’একখান কম্বল দেয়, তায় পায় হামার কপালত নাই।’

নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আব্দুল আউয়াল জানান, শিশু ও নবজাতক ওয়ার্ডে প্রত্যেকেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। ওসব রোগ থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও গরম পানি, গরম খাবার ও গরম কাপড় ব্যবহার করাতে বলা হচ্ছে। শিশুদের অবস্থার অবনতি হলে স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাসপাতালে শিশু বিষেশজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

শিপ্র/শাহোরা/


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!